মুঠোফোনসামগ্রী বিক্রির পাশাপাশি বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের ব্যবসা করেন সূত্রাপুরের বাসিন্দা মো.ফরিদ। সম্প্রতি তাঁর বিকাশের নিবন্ধিত সিম তুলে প্রায় তিন লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে একটি চক্র। ফরিদের মতো এমন অনেক ব্যবসায়ীই এখন এই প্রতারণার শিকার।ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,ওই মুঠোফোন কোম্পানি একজনের সিম আরেকজনকে দিয়ে দেওয়ায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
বিকাশ কর্তৃপক্ষ বলছে,তারা ওই মুঠোফোন কোম্পানির সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। তবে বিকাশের টাকা পাঠানোর জন্য ব্যবসায়ীদের ব্যবহূত পিন কোডের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য সতর্ক করেছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগীদের কথা: ফরিদ বলেন, গত ২৫ মার্চ বিকেলে তাঁর বিকাশের নিবন্ধিত ব্যবসায়িক সিম (এজেন্ট সিম) হঠাৎ অচল হয়ে যায়।তখন সিমে বিকাশের হিসাবে দুই লাখ ৯২ হাজার ৮৫০ টাকা ছিল। তিনি মুঠোফোন কোম্পানি ও বিকাশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন,একজন তাঁর সচল সিমটি বন্ধ করে নতুন একটি সিম তুলে নিয়েছেন এবং মাত্র পাঁচ মিনিটেই সব টাকা অন্য মুঠোফোন নম্বরে স্থানান্তর করেছেন।
এ ঘটনায় তিনি ওই দিন সূত্রাপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং ১ এপ্রিল মামলা করেন। ফরিদ বলেন, তিনি জানতে পারেন, সূত্রাপুর থানার এস কে দাস রোডে মুঠোফোন সেবাকেন্দ্র ‘আল ফাতাহ বিজনেস পয়েন্ট’ থেকে তাঁর সিমটি তোলা হয়েছে। তিনি পুলিশসহ সেখানে যান। পুলিশ ওই কেন্দ্রের মালিক জাবের হোসেন ওরফে বাকেরসহ দুজনকে আটক করে। তাঁদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে সূত্রাপুরের নারিন্দা থেকে সাইফুল ইসলাম (সানি) নামের আরেক যুবককে আটক করা হয়।মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার এসআই জসিম উদ্দিন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে বাকের জানান, ওই দিন তাঁর কাছে সাইফুল দুই যুবককে একটি সিম তুলতে পাঠান। সাইফুল তাঁকে ফোনে জানান, সিমটি তাঁর চাকরিস্থলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার। পূর্বপরিচিত বলে সাইফুলের কথায় বিশ্বাস করে তিনি সিমটি দিয়ে দেন।অনুসন্ধানে জানা যায়, গ্রেপ্তার এড়াতে আটক ব্যক্তিরা ফরিদকে দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা দেন। এরপর পুলিশ তাঁদের ছেড়েদেয়।
জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহের জন্য তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আবার গ্রেপ্তার করা হবে।’যোগাযোগ করা হলে ওই মুঠোফোন সেবাকেন্দ্রের মালিক জাবের বলেন, সাইফুল মিরপুরে একটি মুঠোফোন কোম্পানির গ্রাহকসেবা কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক।দূরসম্পর্কের ভাগনে এবং আগে তাঁর দোকানে চাকরি করায় বিশ্বাস করে তিনি সিম দিয়েছেন।এ ব্যাপারে সাইফুল বলেন, ‘আমি সিম দেওয়ার সুপারিশ করেছিলাম। তবে কাগজপত্র ছাড়া দিতে বলিনি।’ফরিদের মতোই প্রতারণার শিকার তোপখানা রোডের ইলেকট্রিক প্লাজার ব্যবসায়ী পলাশ সাহা। তিনি বলেন, তাঁর সিম তুলে বিকাশ হিসাবে থাকা প্রায় ৬৭ হাজার টাকা অন্য একটি মুঠোফোনে স্থানান্তর করা হয়। এ ব্যাপারে তিনি শাহবাগ থানায় জিডি করেন এবং বিকাশ কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানান। পুরান ঢাকার কাপ্তানবাজারের ব্যবসায়ী জিল্লুর রহমান বলেন, তাঁর প্রায় এক লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।পিন নম্বর জানল কীভাবে?: বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে হলে প্রত্যেক ব্যবসায়ীর নিজস্ব একটি পিন নম্বর থাকে। ওই নম্বর দিয়েই টাকা পাঠাতে হয়।অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিকাশের কোনো কর্মকর্তা সেজে প্রতারক চক্র প্রথমে কোনো ব্যবসায়ীর কাছে ফোন করে কৌশলে পিন নম্বরটি জেনে নেয়। অথবা গ্রাহক সেজে দোকানে গিয়ে টাকা পাঠানোর কথা বলে পিন নম্বর আয়ত্ত করে। ব্যবসায়ী ফরিদ বলেন, সাইফুল ইসলাম আগে তাঁর দোকানে বেশ কয়েকবার এসেছিলেন।সিম তোলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রতারক চক্র পরিচিত বিভিন্ন মুঠোফোন কোম্পানির ছোট ছোট কেন্দ্র থেকে কোনো প্রমাণ ছাড়াই সিম তুলে নেয়।
বিকাশের বক্তব্য: বিকাশের বিপণন বিভাগের প্রধান সানিয়া মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর ফলাফলের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ধরনের প্রতারণা রোধে আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছি এবং নিচ্ছি।’বিকাশের কর্মকর্তারা বলেন, প্রতারণা রোধে এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য তাঁরা সাতটি নির্দেশনা দিয়েছেন। সেগুলো হলো: ফোনে কারও নির্দেশনায় নম্বর ডায়াল না করা, ফোনে পুরস্কার বা লটারির ডাকে সাড়া না দেওয়া, ফোনে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ না করা, পিন নম্বর না বলা উল্লেখযোগ্য। কর্মকর্তারা বলেন, প্রত্যেক ব্যবসায়ীর কাছে প্রতি সপ্তাহে খুদে বার্তা পাঠিয়ে পিন কোড পরিবর্তনের জন্য তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ওই মুঠোফোন কোম্পানির কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথাবার্তা চলছে।