প্রকাশকালঃ
শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৪
সস্পাদনায়
Unknown
চার দিনে হয়নি বলে ২০ মাসেও কি হবে না মহানগর আ'লীগের কমিটি !
নিজেস্ব প্রতিনিধি: ৯ বছর পর ২০১২ সালের ২৭শে ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কাঙ্ক্ষিত সম্মেলন হয়। ওই দিন কমিটি ঘোষণা না করে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছিলেন, চার দিন পর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দিন মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হবে। সম্মেলনের ২০ মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু এখনও ঘোষণা করা হয়নি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এ নিয়ে ধোঁয়াশায় নগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। নতুন কমিটি আদৌ ঘোষিত হবে, নাকি নিকট ভবিষ্যতে হবে না, মহানগর কমিটি উত্তর-দক্ষিণ দু’ভাগে বিভক্ত হবে কি হবে না- এ নিয়ে অন্ধকারে তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহানগর আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট কামরুল ইসলামের মধ্যে অখণ্ড ঢাকার সভাপতি পদ নিয়ে ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেই কমিটি ঘোষণা করা যাচ্ছে না।
এদিকে রাজধানীর ৪৯টি থানা, ১০৩টি ওয়ার্ড ও ১৭টি ইউনিয়নের বেশির ভাগ সম্মেলন পর্যায়ক্রমে শেষ হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন থানা-ওয়ার্ড-ইউনিয়ন কমিটি ঘোষিত হয়নি। এর মধ্যে ডেমরা, শ্যামপুর, কদমতলী ও যাত্রাবাড়ী বাদে মহানগরের সকল থানা, ওয়ার্ড সম্মেলন শেষ হলেও মহানগর কমিটি না হওয়ায় সেগুলোর কমিটি গঠন করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন মহানগরের কয়েকজন নেতা। এ নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে মহানগরের থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে। স্থবির হয়ে পড়েছে দলীয় কার্যক্রম। নতুন কমিটি গঠন ও ঢাকার কমিটি দু’ভাগে বিভক্ত করার বিষয়ে কোন সুরাহা না হওয়ায় মহানগর আওয়ামী লীগে বেড়েছে দলাদলি ও কোন্দল। এ কারণে কমিটি গঠন প্রক্রিয়াও পিছিয়ে যাচ্ছে বারবার। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কমিটি গঠন নিয়ে দলীয় নেতারা দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালের জুনে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফকে সভাপতি ও মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকে সাধারণ সম্পাদক করে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিতে এডভোকেট কামরুল ইসলাম ও হাজী সেলিম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাঈদ খোকন ও শাহে আলম মুরাদ সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত হন।
২০০৬ সালের নভেম্বরে মোহাম্মদ হানিফ মারা যান। এরপর ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি ওমর আলী। কিছুদিন পর নেতা-কর্মীদের বিরোধিতার মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর নতুন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন একেএম রহমতউল্লাহ। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি পলাতক থাকায় কিছুদিনের মধ্যে তাকেও সরে যেতে হয়। এরপর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয় এমএ আজিজকে। তিনি এখনও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, ২০০৭ সালে এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর মায়া দেশত্যাগ করলে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন কামরুল ইসলাম। ২০০৯ সালে দল ক্ষমতায় আসার পর মায়া দেশে ফিরে আসেন এবং আবারও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব বুঝে নেন। এরপর থেকে তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সর্বশেষ সম্মেলনে ভোটাভুটিতে না গিয়ে সবাই নতুন কমিটি গঠনের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার ওপর। পাশাপাশি এ-ও ঘোষণা করা হয় নতুন কমিটি গঠন না হওয়া পর্যন্ত আজিজ-মায়া কমিটি দায়িত্ব পালন করবে। ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তারাই দায়িত্ব পালন করছেন।
মহানগর আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানান, দীর্ঘদিন ধরে কমিটি ঘোষণা না হওয়ায় নগর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। এছাড়া ওয়ার্ড, থানা, ইউনিটে চলছে নেতায় নেতায় বিবাদ, গ্রুপিং ও কোন্দল। নগর কমিটি গঠন, মহানগরকে দুই ভাগে বিভক্ত করা না করা, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে নেতাদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছে প্রায় প্রকাশ্যে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত নতুন কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে মায়া ও কামরুল অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ চলছে। বর্তমান কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, নিকট ভবিষ্যতে কমিটি গঠন না হলে এ বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করবে। এছাড়া ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগকে উত্তর দক্ষিণ এই দুই ভাগ করা হলে সেক্ষেত্রে দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে সাবেক মেয়র হানিফপুত্র সাঈদ খোকন ও বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শাহে আলম মুরাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। তবে দ্বন্দ্বের বিষয়টি অস্বীকার করে শাহে আলম মুরাদ বলেন, মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু আমার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে তার কোন বিরোধ নেই।
মহানগরের কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের বিষয়। বিষয়টি আমরা দলীয় সভানেত্রীর ওপর ন্যস্ত করেছি। কমিটি গঠন নিয়ে তিনি যা ভাল মনে করবেন তাই করবেন। তবে সেপ্টেম্বরেই কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, শুধু পদ-পদবি নিয়েই নয়, ঢাকা মহানগর কমিটির অখণ্ডতা নাকি উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগে বিভক্ত হবে, তা নিয়েও চলছে বিবাদ ও কোন্দল। এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে মতবিরোধ। জানা গেছে মায়া, কামরুল ও সাঈদ খোকন মহানগরের অখণ্ড কমিটির পক্ষে। এমএ আজিজ, হাজী সেলিম ও মুরাদ দু’টি কমিটির পক্ষে। এর মধ্যে মায়া ও কামরুল অখণ্ড ঢাকা মহানগর কমিটির সভাপতি পদপ্রত্যাশী।
সূত্র জানায়, ঢাকা মহানগরকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দু’ভাগে ভাগ করার বিষয়ে শীর্ষ পর্যায়ের সম্মতি থাকলেও ঢাকা মহানগরের অন্তত তিনজন প্রভাবশালী নেতার বিরোধিতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তা ঝুলে আছে। মূলত এ কারণে নেতারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। এতে থানা ও ওয়ার্ড কমিটি ঘোষণা করতেও বিলম্ব হচ্ছে। একই সঙ্গে পদ-পদবি নিয়েও নেতাদের বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।
দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে, মহানগর কমিটি দুই ভাগ (উত্তর ও দক্ষিণ) করার ইচ্ছা মহানগর নেতাদের সামনে বহু আগেই প্রকাশ করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। মূলত তার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতেই ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। ঢাকা মহানগরীর সীমানা ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি, কোন্দল ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত এড়ানো এবং ভবিষ্যতে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন মোকাবিলার জন্য শেখ হাসিনা এমন ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন বলে জানান আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।
তারা জানান, ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত হওয়ায় ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিও দু’ভাগে বিভক্ত করার আলোচনা চলে আসছিল দীর্ঘদিন ধরেই। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকসহ দলীয় ফোরামের বিভিন্ন আলোচনায় শেখ হাসিনা নিজেও এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এমএ আজিজ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বড় রাজনৈতিক দল। সেখানে প্রতিযোগিতা থাকতে পারে কিন্তু পদ-পদবি নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। এগুলো কথার কথা।
কমিটি গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম যা সিদ্ধান্ত নেবে তা-ই হবে। তারা কাকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বানাবে এটি একান্তই তাদের বিষয়। তবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি এবং থাকবো।